বাংলার নতুন "সভ্যতা": পেগ, প্রাইড আর প্রগতির প্যারাডক্স
চন্দ্রিল ভট্টাচার্যএর একটি সাম্প্রতিক কথা সত্যি !
মাত্র বছর কুড়ি আগেও দৃশ্যটা অন্য রকম ছিল। তখন সামাজিক অনুষ্ঠান বা পাড়ার পার্টিতে মদের গ্লাস হাতে দেখা মানেই একটু আড়াল খোঁজা, গলা নামিয়ে কথা বলা আর কাসুন্দি ভাঙার মতো ব্যাপার। মদের বোতল টেবিলের তলায় লুকিয়ে রাখাই ছিল ভদ্রতার মাপকাঠি।
কিন্তু সে দিন আর আজ এক নয়! এখনকার যুগে পার্টিতে ঢোকার মুখেই আপ্যায়নের নমুনা পাল্টে গেছে। সগর্বে, মাইক ফুঁকে জানতে চাওয়া হয়— "কী নেবেন? কোন ব্র্যান্ড?" আর আপনি যদি ভুলবশত ‘না’-র দলে পড়েন, তবে বিপদ! আপনাকে শুধু এলিয়েন বলে মনে করা হবে না, সাথে কানের কাছে ধেয়ে আসবে ব্যঙ্গাত্মক বাণ— "আরে ভালোমানুষ মশাই, একটু দুধ খাবেন নাকি? ফলের রস গ্লাসটা দেব?" যেন মদ না খাওয়া এক ধরনের মারাত্মক অপরাধ বা কম-উন্নয়নশীলতার লক্ষণ।
গোপনীয়তা থেকে সগর্ব আস্ফালন
এই নতুন বাংলা কবে আর কী করে জন্মাল, তা নিয়ে আজ থেকে এক দশক পরে গবেষকরা নিশ্চয়ই পিএইচডি করতে বসবেন। কিন্তু আসল ট্র্যাজেডি হলো, এই "মডার্ন" কালচারের প্রভাব শুধু মদ খাওয়াতে আটকে নেই। এই পরিবর্তনের হাওয়া এখন মননেও লেগেছে।
আগে যে সমস্ত কথা একটু লজ্জায়, কোণায় গিয়ে গলা নামিয়ে চুপিচুপি বলতে হতো, আজ তা বুক ফুলিয়ে বাজারে খাপের খোলে বের করা যায়।
"হিন্দু ভালো, মুসলিম খারাপ।"
"ও মা, ঝি-চাকরদের মতো দেখতে তার আবার বড় বড় কথা"
"কমিউনিস্ট মানেই নকশাল আর একটা আস্ত মশকরা।
"দুর্গাপুজো মানে ঘাস খেয়ে চণ্ডী পড়া".
"ফুটপাতের গরিব মা আর হকারগুলোকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া তো এক ধরনের সমাজসেবা!"
আজকের দিনে শিক্ষিত বাঙালির একটা বড় অংশের রাজনীতি দর্শন মানেই— এক বিশেষ পার্টির প্রতি অন্ধ ঘৃণা থেকে অন্য একটা কুৎসিত গ্যাংয়ের কোলে গিয়ে লাফিয়ে পড়া। অন্ধভক্তি এখন এতটাই বেত্রাহত যে, সত্য বা মিথ্যার বালাই নেই।
হাওড়া ব্রিজ আর উলটো স্রোত
গর্ব করে বলা হতো— "What Bengal thinks today, India thinks tomorrow" (আজ বাংলা যা ভাবে, কাল ভারত তা ভাবে)। বর্তমানের জাঁতাকলে পড়ে আজ মনে হয়, এর চেয়ে বড় রসিকতা আর কিছু হতে পারে না।
আজ সারা দেশ যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের একটা বড় অংশ ব্যস্ত মুসলিম আর কমিউনিস্টদের "শাস্তি" দিতে দিতে নিজের শিরদাঁড়াটা সস্তায় বাজারে বেচে দিতে।
নচিকেতা চক্রবর্তীর বিখ্যাত গানটা হয়তো আজ আর কেউ গায় না। — "তুমি না থাকলে দেশটা আজ গুজরাট হয়ে যেত!"
কারণ গুজরাট হতে তো আর আলাদা রাজ্যের দরকার হয় না, মননে যখন খোলামেলা বুলডোজার চলে, তখন ঘরের কোণেই গুজরাট পত্তন হয়ে যায়।মদের পেগ আর বুক ফুলিয়ে বলা নিরক্ষর —অসহিষ্ণুতাই এখন আমাদের নতুন "স্টেটাস সিম্বল"।
বাকি রইল শুধু একটা প্রশ্ন— এই সভ্যতার রথের চাকা শেষ কোথায় গিয়ে থামবে? নাকি থামার কোনো ইচ্ছেই আর এ রাজ্যের নেই?
- Anirban

Comments
Post a Comment