একজোড়া রামধনু

 "এটি হলো ভারতের মিনি সুইজারল্যান্ড,  বুঝলি!"  খুবই উৎসাহের সঙ্গে আমার বন্ধু প্রসেনজিৎ সেদিন এই তথ্যটি আমাদের জানিয়েছিল। গন্তব্য ঠিক হবার পরে যাবার দিনের সিদ্ধান্ত নিতে ব্যস্ত আমরা সকলে কেউই সেদিন ‌ঐ কথায় তেমন গুরুত্ব দেই নি। তার উপর এতদিন ক্যামেরা কাঁধে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর ফলে এটুকু জানতাম, যেকোনো প্রাকৃতিক সুন্দর সবুজ পাহাড়ি জায়গাকে এইরকম মিনি অথবা little সুইজারল্যান্ড বলার প্রবণতা আমাদের অনেক দিনের।




সেদিন ভোরবেলা,‌ চোপতা থেকে চন্দ্রশিলার  ট্রেকিং পথে (প্রায় ১১000 ফিট উচ্চতায়, ) হিমশীতল ঠাণ্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে দুধসাদা নন্দা দেবীর মাথায় সোনার আলোর প্রতিফলন দেখে প্রসেনজিতের সেদিনের উত্তেজনা মনে পড়ে গেছিল। সঙ্গে এও বুঝেছিলাম এই সৌন্দর্য  সত্যিই অদ্বিতীয়।

উত্তরাখণ্ডের এই চোপতা ভ্যালির সৌন্দর্য সত্যিই অনন্য। নিজের চোখে এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার লোভে আমরা যাত্রা শুরু করলাম সেপ্টেম্বরের এক ভোরবেলায়। ঋষিকেশে গরম দুধ চা , রুদ্রপ্রয়াগে অলোকনন্দা-মন্দাকিনীর ছবি তোলা, শ্রীনগরে মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমরা  অবশেষে যখন চিরসবুজ meadows চোপতা ভ্যালিতে পৌঁছলাম সূর্য প্রায় অস্ত যাবার উপক্রম। অন্ধকার হয়ে আসছিল। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়া পাখিদের কিচিরমিচির, বনের সেই পরিচিত গন্ধ , পাহাড়ি ঠান্ডা হাওয়া,   সন্ধের আবছা রহস্যময় আলোয়  যেন এক প্রত্যাশিত স্বর্গ।  একটু পরেই ঘন অন্ধকার আমাদের জড়িয়ে ধরল। অদ্ভুত নিস্তব্ধতার মাঝে nightjar আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা আওয়াজ শুনতে শুনতে আমরা ট্নেট্ এ ফিরে গেলাম। হিমালয়ের কোলে ঘন জঙ্গলের রহস্যময় এই রাত্রির এক আলাদা রোমান্টিকতা আছে। অনন্ত নীরবতা মাঝে হঠাৎ চমকে দেওয়া রাত জাগা পাখির ডাক,  যেন রূপকথার আকাশে মেঘেদের সঙ্গে চাঁদের লুকোচুরি , দূরে ঘন অন্ধকারে অসংখ্য জোনাকি -আজ রাতে প্রকৃতির প্রত্যেকটি অঙ্গ যেন নিজের রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত।  আমরা চার বন্ধু আমাদের ছোট্ট ক্যাম্প ফায়ারের পাশে প্রকৃতির অদ্ভুত সৌন্দর্যের নেশায় মগ্ন হয়ে রইলাম।




ভোররাতে পাখিদের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙতেই আমরা চটপট তৈরি হয়ে নিলাম।  রাস্তার পাশে ছোট্ট ছিমছাম দোকানে গরম চা আর ম্যাগি খেতে খেতে দেখলাম ঘন সবুজের দিগন্তসীমায় সাদা  হিমালয় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। চোপতা - তুঙ্গনাথ ট্রৈকিং এরএকটা বৈশিষ্ট্য আছে। আশেপাশে বিশেষ সৌন্দর্য বা প্রকৃতির আসল রূপ দেখার জন্য প্রায় ৮-১০কিলোমিটারের অপেক্ষা করতে হয় না। এখানে শুরু থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপে খুঁজে পাওয়া যায় এক অজাগতিক সৌন্দর্যের ভান্ডার।  ঠিক যেন কোন অদৃশ্য মাইকেল এঞ্জেলো নিজের হাতে তৈরি করে রেখেছেন প্রকৃতির এই ল্যান্ডস্কেপ। কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও আকাশছোঁয়া পাইন গাছ "ঊর্ধ্বে উঁচায়ে মাথা দিল ঘুম " , আবার কোথাও সুদূর বিস্তৃত সবুজ কার্পেট দিগন্তে গিয়ে মিশেছে সাদা পর্বত মালায়। প্রতিটি বাঁকে যেন অপেক্ষা করে আছে এক নতুন ফ্রেম!



উত্তরাখণ্ডের এই অঞ্চলটি বরাবরই bird watchers দের জন্য স্বর্গরাজ্য। অসংখ্য বিরল প্রজাতির হিমালায়ান পাখিদের দেখা পাওয়া যায় এখানে। Snow Partridge, kollass, phesant kalij, golden eagle , bearded vulture,  upland buzzard,  Himalayan owl , spot winged rosefinch,  rufous bellied woodpecker,  European goldfinch , ashy wood pigeon , fire capped tit,  spotted thrush,  Nepal Wren Babbler ইত্যাদি পাখিদের দেখা অনেকটা সহজেই পাওয়া যায়। ওক গাছের ছায়ায় চওড়া পাথরে  বসে একটু বিশ্রাম নিয়েই এগিয়ে চললাম চড়াই । চোখে পড়ল golden bush Robin white browed bush Robin , Himalayan rosefinch আরো কত কি। যদিও সেলিব্রেটি আকর্ষণ দুর্লভ Himalayan monal তার দেখা এখনো দেয়নি।
চলার পথে কত বার যে দাঁড়িয়েছি  - কখনো ছবি তোলার জন্য,  কখনো একটু বিশ্রাম,  কখনো বা শুধুই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে- তার কোন হিসেব নেই। প্রতি মুহূর্তেই অদ্ভুত ভাবে এখানকার পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া বদল হতে থাকে। সুন্দর স্বর্ণালী রোদ্দুর হঠাৎ ডেকে যায় ঘন সাদা কুয়াশায়। দু পা এগোতেই নীল আকাশে একপশলা কালো মেঘ সবাইকে ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায়। 10 হাজার ফিট উচ্চতায় হঠাৎ যেন জাদু ছোঁয়ায় আশেপাশের দৃশ্য বদলে যায়। আকাশছোঁয়া ও পাইন ,ওক উধাও হয়ে চারদিকে ভরে যায় দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতার সাদা, লাল আর গোলাপি রডোডেনড্রনের রঙিন উৎসবে।



এই অদ্ভুত দৃশ্য দুচোখ ভরে দেখতে  দেখতেই হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেল। ক্লান্ত শরীর , ঝরঝরে মন  ,‌পাহাড়ি ফুলের গন্ধ , হিম ঠান্ডা বৃষ্টির জলে যেন এক পুনর্জীবন।


একটু এগোতেই ঠিক জল-ছবির মত চারদিকে সবুজের মধ্যে দেখতে পেলাম সেই ছোট্ট পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি চালাঘর টি। হাসিমুখে ভিতরে বসতে বললেন প্রবীণ দম্পতি। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় সবুজে ঘেরা গাড়ওয়াল হিমালয় উপত্যকায় এই ছোট্ট কুটিরে বসে রডোডেনড্রন জুস খেতে খেতে আমরা গল্প করছিলাম কিষানজী ও রেনুকা দেবির সঙ্গে। কিষানজী কাছে শুনলাম এনাদের মতো অনেকেই উখিমঠ আরো অন্যান্য কাছাকাছি গ্রাম থেকে এসে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত থাকেন। এই সময় চোপতা, তুঙ্গনাথ অঞ্চলে বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য চা ইত্যাদি  বিক্রি করেন। শীতকালে এখানকার তাপমাত্রা কমে গিয়ে প্রায় - 15 ডিগ্রী হয়ে যায়। সেই সময় পুরো অঞ্চল বরফে ঢেকে থাকে। রেনুকা দেবি গর্বের সঙ্গে জানালেন তাঁর একমাত্র নাতি দেরাদুনে পড়াশোনা করে।  তার ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার হবে। বৃষ্টি কমতেই সোনালী রোদে আবার ভরে উঠলো পুরো উপত্যাকা। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে ধন্যবাদ আর বিদায় জানিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে।




আমাদের প্রথম দিনের ট্রেক শেষ হলো 12070 ফিট তুঙ্গনাথে।  'চার কেদারের'  একটি তুঙ্গনাথ মন্দির ভারতের উচ্চতম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শিব মন্দির । সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, অবিস্মরনীয় অভিজ্ঞতার পর প্রথম গন্তব্যে পৌঁছানোর অনুভব ভাষায় প্রকাশ করা না গেলেও প্রায় সব মাউন্টেনিয়ার এবং ট্র্যেকারাই উপলব্ধি করেছেন।  উপরি পাওনা তুঙ্গনাথের এই অদ্বিতীয় সৌন্দর্য। যা সবাইকে বার বার টেনে আনে। সূর্য অস্ত যাওয়ার  মুহূর্তে ভেসে এলো মন্দিরের আরতির শব্দ। একই সময়ে ঠিক ম্যাজিকের মত ঘন কালো মেঘের এক ফাঁক দিয়ে হঠাৎ একফালি সোনা রোদ্দুর এসে পড়ল মন্দিরের চূড়ায়। হয়তো কয়েক সেকেন্ডের সেই মুহূর্ত, তবে কোনদিনও ভোলার নয়।



রাতে আবার নামল বৃষ্টি। মুষলধারে বৃষ্টি, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা , তারি মাঝে গণেশের ( মন্দিরের কর্মী) তৈরি গরম গরম খিচুড়ি আর আলু ভাজা এমন একটা দিনের এর থেকে ভালো শেষ আর কি হয়! ক্লান্ত শরীর , পরিতৃপ্ত মন - কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কারনেই মনে নেই।

তখনো ঘন অন্ধকার। বরফের মতো ঠান্ডা হওয়া। ঘড়িতে সকাল চারটে। আমরা চলেছি আজকের গন্তব্য চন্দ্রশিলার পথে। ভোর রাতে বৃষ্টি কমে গিয়ে এখন আকাশ ভরা তারা। যারা চোপতা- তুঙ্গনাথ কে "easy trek " তালিকাভুক্ত করেন তাদের জন্য একটি সতর্কীকরণ -তুঙ্গনাথ চন্দ্রশিলা পথের এই অংশটি কিন্তু বেশ জটিল। প্রথমত , সূর্যোদয়ের সময় পৌঁছানোর জন্য অন্ধকারেই পথ চলতে হবে। দ্বিতীয়তঃ,  নির্দিষ্ট কোন ট্রেক পথ না থাকায় বেশ কিছু ভয়ঙ্কর এবং বিভ্রান্তিকর বা৺কে পথ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।




অনেকেই বলেন যদি আপনি চন্দ্রশিলা থেকে সূর্যোদয় না দেখে থাকেন আপনি পৃথিবীর সবথেকে দর্শনীয় একটি জিনিস থেকে বঞ্চিত। 12106 ফিট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে ৩৬০° পানোরামিক হিমালয় পর্বতমালায় সূর্যোদয়ের সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম তাদের কথার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত না হয়ে উপায় নেই। Eye level এ একসঙ্গে নন্দাদেবী , ত্রিশূল,  কেদার , বান্দারপুনচ এবং চৌখাম্বা - একসঙ্গে এতগুলো পর্বত শৃঙ্গকে নিজের চোখে  দেখার অভিজ্ঞতা কোনদিন হবে ভাবতে পারিনি।  নিজেকে ভাগ্যবান ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন করে  উপলদ্ধি হল প্রকৃতির এই বিশাল বর্ণময় ক্যানভাসে আমরা ঠিক কতটাই ক্ষুদ্র!

গরম গরম চা আর আলুর পরোটা খেয়ে তুঙ্গনাথ থেকে ফিরছি। সুদূর বিস্তারিত সবুজের মধ্যে সাদা কালো বন্য টাট্টু ঘোড়াদের দেখতে দেখতে মন যেন হারিয়ে যায় অনেক দূরে ..



" যে বাঁশিতে বাতাস কাঁদে সেই বাঁশিটির সুরে সুরে ॥
যে পথ সকল দেশ পারায়ে       উদাস হয়ে যায় হারায়ে, সে পথ বেয়ে কাঙাল পরান যেতে চায় কোন্‌ অচিনপুরে "


হঠাৎই সবাইকে চমকে দিয়ে আমাদের ঠিক সামনে, 12- 13 ফিট দূরত্বে এসে বসলো একজোড়া মোনাল।
কয়েক সেকেন্ড বসেই আবার উড়ে গেলো- ঠিক যেন একজোড়া রামধনু সাদা হিমরাজ্যের দেশে। আমরা চারজন সম্মোহিতের মত তাকিয়ে রইলাম অনেকক্ষণ কেউ কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে।  

Comments

Popular posts from this blog

BHAKTOLOGY ( If Not Him, Who?)

Book Reading : Today and Forever

My Room