রাজকীয় রণথম্ভোর
জুন মাসের ফরটি নাইন ডিগ্রী গরমে রাজস্থানের রুক্ষ বনাঞ্চল রণথম্ভোর এর আলোচনা টা যখন শুরু হল স্বাভাবিকভাবেই আমি নিজে খুব একটা উৎসাহিত হই নি। ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি র নেশায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন জঙ্গলে অনেকদিন ঘুরলেও এদিকটায় কোন দিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আর সেই যাওয়া হয়নি বলেই হয়তো অনেকগুলো ভুল ধারণার ভয় ভর করেছিল। জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক এর মত ল্যান্ডস্কেপ আর গ্রাস ল্যান্ড নেই, পশ্চিমঘাটের সে প্রানবন্ত সবুজ নেই, মধ্য ভারতের Kipling এর The Jungle book - রোমান্টিসিজম নেই….. এই এত বড় নেই এর লিস্ট আর সীমিত ছুটির অবকাশের কারণে রণথম্ভোর সেভাবে কোনদিনই টানে নি.
তবে সে যাই হোক, নির্দিষ্ট দিনে আমাদের জিপসি যখন হাইওয়ে ছেড়ে Buffer zone .দিকে এগোলো বুঝতে সময় লাগে নি এতদিন কি ভুলটাই করেছি , না এসে। এখানে তো শুধু ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তন হলো তা নয়, মনে হলো হঠাৎ পুরো টাইম জোন টাই যেন পাল্টে গেল কোন এক জাদুতে। ছোটবেলায় পড়া ইতিহাস বইয়ের পাতায় দেখা সেই ছবিগুলোর মত ঠিক যেন এক রূপকথার রাজত্ব। একদিকে আরাবল্লী উঁচু-নিচু ল্যান্ডস্কেপ -কোথাও গভীর খাদ, কোথাও সবুজে ঢাকা আবার কোথাও রুক্ষ পাহাড়। অন্যদিকে গাছ আর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় ঐতিহাসিক রণথম্ভোর ফোর্ট। এইসবের মাঝখান দিয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা রাস্তা। জঙ্গলের সেই চেনা গন্ধ। কোথাও মোড় ঘুরতেই ছুটে চলে যায় এক পাল সম্বর এর দল.... কোথাও আবার রাস্তার মাঝেই পাথরের প্রবেশদ্বার। তার উপরে দাম্ভিক ভাবে বসে থাকা ন্যাশনাল বার্ড এর এখানে মেজাজি আলাদা। এতো তাদেরই জায়গা এসব তো তাদেরই রাজত্ব। বরঞ্চ আমরাই বেমানান অনেকটা বহিরাগত।
রণথম্ভোর নেশনাল পার্ক এর ভৌগলিক বৈচিত্র সত্যিই অতুলনীয়। যেকোনো ন্যাশনাল পার্কের মতো এখানেও ৩৯২ sq km সংরক্ষিত অঞ্চল বিভিন্ন জোনে ভাগ করা। কোথাও ড্রাই ত্রপিক্যাল ফরেস্ট, পাথুরে এলাকা, কোথাও সবুজ ঘাসের কার্পেট। তবে সে যাই হোক রণথম্ভোর এর প্রত্যেকটা zone যেন ইতিহাসের এক একটা চ্যাপ্টার। ভাঙ্গা ধ্বংসস্তূপ, পুরনো বাউলি, আর পুরো জঙ্গলকেই জড়িয়ে থাকা রণথম্ভোর ফোর্ট … প্রতি মুহূর্তেই করে দেয় অন্য মনস্ক।
রণথম্ভোর এর ওয়াইল্ডলাইফ যেন ঠিক এই ইতিহাসেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ. তেরোশো শতাব্দীর রণথম্ভোর ফোর্ট-এর উপরে লাইন দিয়ে বসে থাকা লেঙ্গুর এর পরিবার , নীল লেকের ধারে ধ্বংসস্তূপের মাঝে ঘাড় উঁচু করে বসে থাকা "নুরজাহান", সবুজ ঘাসের কার্পেটে ছুটে যাওয়া চিতলের এর দল, সূর্যাস্তের ঠিক আগে সোনালী আলোয়, খেলা করা Oriental white eye couple, সেই ব্যস্ত নীলকন্ঠের গাছের কোঠোরে থাকা বাচ্চাকে খাওয়ানো অথবা সেই কাঠফাটা রোদ্দুরে সবুজ জলে সন্ত্রস্ত সম্বর হরিণ এর জল খাওয়া….. দুই হাত দূরে অপেক্ষায় থাকা কুমির… এ সবকিছুই যেন ওই পরিবেশের সঙ্গে একটা অদ্ভূত ভাবে মেলানো। এদের মধ্যে একজনও না থাকলে যেন সবকিছু অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
আমাদের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা zone 3 কোন দিনও ভোলার না। শুনেছিলাম রানী অ্যারোহেড আজকাল তার দুই স্তাবক কে নিয়ে এখানেই থাকেন। যদিও গত দুই সপ্তাহ ধরে নাকি তার দেখা কোন ফটোগ্রাফারই পাননি। তবে core area তে পৌছতেই এখানকার লান্ডসকেপ সব কিছু ভুলিয়ে দিল। এ যেন সত্যি কারের Kingdom of lakes. বিখ্যাত পাদাম lake কে ঘিরে এই বনাঞ্চল। ঘন নীল রঙের জলে দুপুরের সাদা তুলো মেঘের প্রতিচ্ছবি আর চারদিকে শুধু নিস্তব্ধতা। জিপসি র এর ইঞ্জিন বন্ধ হতেই আমরা চারজন এ যেন হারিয়ে গেলাম এক আশ্চর্য জগতে। এর মাঝেই হঠাৎ দেখি লেকের একদিকে অসংখ্য egrets আর cormorant একসাথে উড়ে বেড়াচ্ছে এবং ঘুরপাক দিচ্ছে। আমাদের গাইড হংসরাজ জানালো এই অদ্ভুত এক রিচুয়াল। রোজ সকালে এক নির্দিষ্ট সময়ে কুমিরের দল নদী থেকে মাছ ধরে মুখে নিয়ে লোফালুফি করে। আর সেই মাছের লোভেই এই পাখিরা রোজ মেতে ওঠে কুমিরদের সঙ্গে এই খেলায়। আমরা সবাই এই অদ্ভুত দৃশ্য মন ভরে (এবং ক্যামেরা ভরে) নিয়ে এগিয়ে চললাম। হ্যাঁ ফেরার সময় মেইন গেটের অত কাছে স্বয়ং রানী অ্যারোহেড তার দুই সন্তানকে নিয়ে আমাদের আপ্যায়নের জন্য অমন করে বসে থাকবেন তা আমরা কেন আমাদের গাইড ও ভাবতে পারেননি।
অসংখ্য ঝুরি নেমে আসা বড় বড় বটগাছ। অমনি এক গাছের নিচে বসে আছে মাথা উঁচু করে জঙ্গলের রাজা। ঠিক যেন গম্ভীর ভাবে ভাবছে সাম্রাজ্যের হাল। বিকেলের সোনালী আলো বট গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পড়েছে ঠিক তার উপরে । কয়েকশো বাদুড় উড়ে চলেছে চার পাশে। যেন ব্ল্যাক ক্যাট সোলজারস নজর রাখছে রাজার সুরক্ষার।
মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের সেই দুটো লাইন:


Comments
Post a Comment