কৃষ্ণ মৃগের দেশে
প্রসঙ্গটা সেদিন হঠাৎই উঠলো।
ভ্রমণ পিপাসু, ওয়াইল্ড লাইফ লাভার আমাদের তিন বন্ধুর পায়ে তলায় সত্যি সরষে। আমাদের দেশে খুব কম জাতীয় উদ্যান আছে যেখানে এখনো যাওয়া হয়নি। সেই ছোটবেলা থেকেই mammals নিয়ে আমার গভীর আকর্ষণ, গৌরবের বিষয় পাখি আর স্বপ্নীল ল্যান্ডস্কেপ আর ভিডিওগ্রাফির পারদর্শী - সব মিলিয়ে, সুযোগ পেলেই আমরা তিনজন ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়েছি।
সেদিনের দিল্লির সেই কনকনে ঠান্ডার
আড্ডায় আমাদের গল্পের উড়োজাহাজ যখন ছুটে চলেছে চিতা থেকে ব্রাউন বিয়ার , তাসমানিয়া থেকে আলাস্কা - হঠাৎ স্বপ্ন ীল বলে উঠলো "আচ্ছা তোরা Black Bucks এর ছবি তুলেছিস?
কৃষ্ণ মৃগ ?" এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনজনই আবিষ্কার করলাম, আমরা কেউই আজ পর্যন্ত কৃষ্ণমৃগ দেখিনি!
কুয়াশা ভরা ডিসেম্বরে সকাল। ছুটে চলেছে আমাদের ব্ল্যাক স্করপিও ঝকঝকে NH ৮ ধরে। গন্তব্য রাজস্থানের তাল-ছাপার। ভোরের আলো
পরিষ্কার হবার সঙ্গে
সঙ্গে গুরুগ্রামের বহু তল citi-scape জায়গা করে দিলো
দুই পাশের সবুজ ল্যান্ডস্কেপ। বছরখানেক গৃহবন্দী হয়ে থাকার পর মন ভরে উঠলো সেই পুরনো উত্তেজনা-
এডভেঞ্চারের নেশায়।
রত্নগড় পৌছুনুর বেশ কয়েক মাইল আগেই আশেপাশের দৃশ্য হঠাৎই একদম বদলে গেল। একেবারে 'সোনার কেল্লার' মরুভূমি না হলেও, সুদূর বিস্তৃত রুক্ষ জমি, ঘন নীল আকাশ, অধরা ছায়া আর সবুজের দায়িত্ব পুরোটাই বহন করে চলেছে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা কিছু ফোগি, খেজরি আর বাবুল গাছ। গৌরব রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করাতেই দেখতে পেলাম ঠিক মরুভূমির মরুদ্দ্যান এর মতোই এক ছোট্ট চায়ের দোকান। বাবুল গাছের নিচে এক চারপাই আর দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে গগন সিংয়ের চায়ের দোকান। কথা বলার সুযোগ পেয়ে তার গল্পের শেষ হয় না। তার কাছেই শুনলাম রাত্রে এখানকার তাপমাত্রা দিব্যি মাইনাসে চলে যায়।
GPS lady খবর দিলেন আমরা পৌঁছে গেছি। রাজস্থানের সুদূর ান্তে ছোট্ট এক শহর ছাপার এক নজরে সত্যিই অবাক করে দেয়। চওড়া বাঁধানো ঝকঝকে রাস্তা, ল্যাম্প পোস্ট, বহু দূরে দূরে এক একটি বাড়ি - অনেকটা যেন সেই হলিউডে দেখা western country side landscape. জনবসতি খুবই কম বললেই চলে। পরিবেশের সঙ্গে মানান সই ফরেস্ট গেস্ট হাউস। হেরিটেজ কারুকার্যে তৈরি
গেস্ট হাউসে যখন পৌঁছলাম সূর্য প্রায় দিগন্তের কাছাকাছি। দিনের শেষে পাখিরা ফিরে চলেছে নিজের নিজের বাসায়। উমেশ সিং, ফরেস্ট রেঞ্জার হাসিমুখে ছুটে এসে বললেন "জলদি চলিয়ে, সানসেট হোনেওয়ালা হ্যায়"! গেস্ট হাউজের সঙ্গেই লাগানো স্যাংচুয়ারির গেট। রেঞ্জার সাহেব কে গাড়িতে বসিয়ে ছুটে চললাম সূর্যাস্তকে ধরতে। সোনার বলটিকে দেখার সৌভাগ্য সেদিন ওই কয়েক সেকেন্ডের জন্যই ছিল। কিন্তু ওই ওই কয়েক মুহূর্তের ম্যাজিক কোনদিনই ভোলার নয় ! Grassland যা মনে করিয়ে দেয় আফ্রিকার Savana,pবিশালাকার সূর্য ডুব দিচ্ছে দিগন্তের সীমানায়, সামনে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে নীলগাই আর blackbuck এর দল।
" বন্ধুরা প্রাণ ভরে উপভোগ করো Arabian Nightsএর
রূপকথার গল্প " - গেস্ট হাউজ ের রাজকীয় রুমের
ধবধবে সাদা নরম বিছানায় নিজের ক্লান্ত শরীরকে এলিয়ে দিয়ে ঘোষণা করল গৌরব।
কাচের জানালার পর্দা সরিয়ে জ্যোৎস্না ভরা চাঁদের আবছা আলোয় নিস্তব্ধ এই প্রাচীন বাড়িটিকে দেখে মনে হল গৌরব কিন্তু মোটেও কিছু ভুল বলেনি।
সাধারন কিন্তু সুস্বাদু নিরামিষ খাবার খেয়ে কাঁপতে কাঁপতে লেপের তলায় ঢুকতে গিয়ে মনে হল সামনের দুদিন আর যাই হোক অ্যাডভেঞ্চারের কোনো অভাব হবে না।
কোথাও একটা জংলি মুরগির ডাকে ভোর রাতের স্বপ্নটা ভেঙে গেল। জানলা দিয়ে দেখি স্বপ্নীল এর মধ্যেই তার ড্রোন নিয়ে ব্যস্ত। হাতে চায়ের কাপ। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে পরলো না শেষ কবে এমন নৈসর্গিক সকাল উপভোগ করেছি ,তাও হিমালয়া থেকে এত দূরে!
তাল-ছাপার অভয়ারণ্যে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন একে বলা হয় রাজস্থানের
এক গুপ্তধন।
সম্পূর্ণ অন্যরকম এই ল্যান্ডস্কেপ নানান রংবেরঙের বিরল পাখির বাসস্থান। আবার বছরে নির্দিষ্ট সময়ে আসে পর্যটক পাখিদের দল। প্রায় ১০ স্কয়ার কিলোমিটারের এই স্বর্গীয় অভয়ারণ্যে খেলে বেড়ায় তিন হাজারেরও বেশি কৃষ্ণ মৃগ। একটু সময় কাটালেই দেখা মেলে Jungle cat, desert fox, desert
gerbils, chinkara, spiny tailed lizards আরো কত কি!
সূর্য তখন প্রায় মাথার উপরে । গ্লাসল্যান্ডের এক জায়গায় জিপসি দাঁড় করিয়ে রেঞ্জার সাহেব বললেন, এখানকার এই বিশেষ ঘাসের
নাম মোতিয়া, যেটা সম্ভবত মোতি বা মুক্ত (pearl) থেকে এসেছে। এর স্বাদ ও নাকি খুব মিষ্টি। Black buckএর খুব প্রিয় এই মতিয়া ঘাস খুব নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গাতেই পাওয়া যায়।
প্রকৃতির এই অদ্ভুত বৈচিত্র্যে বিভোর হয়ে আমরা তখন blackbuck ফ্যামিলির ছবি তুলতে ব্যস্ত, হঠাৎ স্বপ্নীল ইশারা করে এক খেজরি গাছের দিকে দেখালো। রাজকীয় ভঙ্গিতে সেখানে বসে আছে এক Monagu's Harrier. গম্ভীরভাবে সে যেন তার রাজ্যের মাপ যোগ করে নিচ্ছে। এই বিশালকায় তৃণভূমি বহু প্রজাতির সরীসৃপের প্রজনন স্থল। তারই ফলস্বরূপ, Mars harrier, pale harrier, imperial eagle, Tony eagle,
shot Tod eagle sparrow hawk বহু প্রজাতির শিকারি পাখিদের প্রিয় জায়গা এই তালছাপার অভয়ারণ্য। গৌরবের ক্যামেরার সাটার এর আওয়াজ অবিশ্রান্তভাবে বেজেই চলেছে।
আমরা আবার মন দিলাম সেলিব্রেটি কৃষ্ণমৃগের দলের দিকে। ভাবলে অবাক লাগে, এই স্বর্গীয় অভয়ারণ্য এক সময় বিকানেরের মহারাজের প্রিয় শিকারের জায়গা ছিল। মরুভূমির কাটা গাছে ঘেরা বনাঞ্চল আজ পরিণত হয়েছে এক অনন্য জীববৈচিত্রের নিদর্শন। এখানকার অসংখ্য স্থায়ী এবং অস্থায়ী পাখি,
মনের আনন্দে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ানো Blackbuck এবং অন্যান্য বাসিন্দারা
গল্প বলে এক সফল সংরক্ষণের। এই কৃতিত্ব পুরোটাই যায় রাজস্থানের বন বিভাগ আর স্থানীয় বাসিন্দাদের।
দুপুরবেলা অসাধারণ সুস্বাদু ডাল বাটি চুরমা খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আশেপাশের জায়গা দেখতে। বিকানেরর এর মহারাজার দুর্গ এখন বাচ্চাদের স্কুল। সে এক দেখার মত জায়গা। বিশালকায় সদর দরজার উপরে রাজকীয় ভঙ্গিমায় জাতীয় পাখি যেন আমাদেরই
স্বাগতম জানাবার অপেক্ষায় বসে। আমাদের পৌঁছানোর আগেই বাচ্চাদের সেদিনের মত ছুটি।
কিন্তু পাশের জলাশয় থেকে ভেসে আসছে অসংখ্য হাঁসের কলরব। ফেরার পথে আলাপ হলো স্থানীয় বাসিন্দা আনন্দ জীর সঙ্গে। সরল সাদাসিধে ভদ্রলোক জোর করে নিয়ে গেলেন ওনার বাড়ি, খুব সম্প্রতি যেটি উনি ভ্রমনার্থীদের জন্য হোমস্টে হিসেবে ব্যবহার করছেন। তালছাপার অভয়ারণ্যের আশেপাশে রয়েছে ১৫টি গ্রাম। সবমিলিয়ে তার জনসংখ্যা ৪০ হাজারের খুব বেশি না। চা খেয়ে উনার সঙ্গে ঘুরে আসলাম গোশালা। ৪০০০ হেক্টর এর এই বাফার অঞ্চলেও ঘুরে বেড়াচ্ছে শয় শয় কৃষ্ণ মৃগ আর
শিকারি পাখির দল।
সে যাই হোক,
দুপুরবেলা নির্বিঘ্নে বসে থাকা desert fox দম্পতি আমাদের গাড়ির শব্দে মোটেও খুশি হয়নি। এক ছুটে তাদের গর্তে ঢুকে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি,
আনন্দ জী হঠাৎ হাত তুলে দেখালেন। নীল আকাশে পাখনা মেলে উড়ে চলেছে একজোড়া ইজিপশিয়ান ভালচার। কাজে লেগে পরল গৌরবের ৫০০ এম এম টেলি লেন্স। আমরা শুধু প্রাণ ভরে দেখলাম দুরন্ত pharaoh's chicken যুগল।
জমিয়ে ঠান্ডা পরলো রাতে। গেস্ট হাউজের বাগানে আগুন জ্বালিয়ে বসলাম আমরা। উমেস জীর কাছে শুনলাম রাজস্থানের চুরু অঞ্চলের বহু জানা অজানা তথ্য আর মজাদার গল্প। গরম গরম আলু পরোটা আর আলুর তরকারি খেয়ে
দৌড়লাম লেপের তলায়।
ভোরের আকাশের ঘন কুয়াশার মতই একরাশ মন খারাপ নিয়েই ফেরার সফর শুরু। একইসঙ্গে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করলাম। এর থেকে বেশি আর কি বা পাওয়ার থাকতে পারে!

Comments
Post a Comment